ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ক্রেমলিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দখলকৃত দনবাস নিয়ে তারা কোনো প্রকার আপস করতে রাজি নয়।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি শুরু হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির একটি সম্ভাবনা উঁকি দিলেও মস্কোর কঠোর অবস্থান কিয়েভকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আবুধাবির এই বৈঠকটি যুদ্ধ শুরুর পর তিন পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের পরিচিত বৈঠক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই আলোচনার সময়টি বেশ জটিল।
একদিকে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবি পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, অন্যদিকে রুশ হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় দেশটির সাধারণ মানুষ এক ভয়াবহ শীতকালীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিশ্চিত করেছেন যে, তিন পক্ষের আলোচক দল বর্তমানে আলোচনায় বসেছে এবং এটি দুই দিনব্যাপী চলবে। তিনি সাংবাদিকদের পাঠানো এক ভয়েস নোটে জানান, কিয়েভের প্রতিনিধি দল তাদের লক্ষ্য সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাশিয়া তাদের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে পাঠিয়েছে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ-এর প্রধান অ্যাডমিরাল ইগর ক্যকভকে। বিশ্লেষকদের মতে, একজন গোয়েন্দা প্রধানকে আলোচনার নেতৃত্বে রাখা এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, ক্রেমলিনের ফোকাস এখন রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে সামরিক বাস্তবতার দিকেই বেশি।
মস্কোতে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে সপ্তম দফা বৈঠকের পরেই এই ত্রিপক্ষীয় সংলাপের আয়োজন করা হয়। উইটকফের সঙ্গে এই মিশনে যোগ দিয়েছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং সম্প্রতি গাজার জন্য ট্রাম্পের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত জশ গ্রুনবাউম। ক্রেমলিনের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, আলোচনা সব দিক থেকেই ফলপ্রসূ ছিল এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে ত্রিপক্ষীয় ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠক আবুধাবিতে হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে আলোচনা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে ক্রেমলিন পুনরায় দাবি তুলেছে যে, যুদ্ধ শেষ করতে হলে কিয়েভকে অবশ্যই পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চল থেকে তাদের সব সেনা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইউক্রেনের বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রেখে কোনো সমঝোতা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি রাশিয়ার অনেক কর্মকর্তা কিয়েভে সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
জার্মান সরকার এই আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। জার্মান সরকারের মুখপাত্র স্টেফেন মেয়ার প্রশ্ন তুলেছেন, রাশিয়া কি আদৌ তাদের সর্বোচ্চ দাবি থেকে সরবে? তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন কোনো চুক্তি অর্থহীন যা রাশিয়াকে ভবিষ্যতে আবারও হামলার সুযোগ করে দেবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও জোর দিয়ে বলেছেন, দনবাস থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রত্যাহার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন একটি শান্তিচুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে চাপ দিচ্ছে। ট্রাম্প সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, পুতিন ও জেলেনস্কি যদি চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন, তবে তারা 'বোকা' হিসেবে গণ্য হবেন। তবে ড্যাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, শান্তি আলোচনার একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বর্তমানে বিশ্ব তাকিয়ে আছে আবুধাবির দিকে, যেখানে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় নির্ধারিত হতে পারে ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
এমআই/টিএ