সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে প্রস্তাবিত কিউব আকৃতির আকাশচুম্বী ভবন 'দ্য মুকাআব'-এর নির্মাণকাজ স্থগিত করা হয়েছে। এই প্রকল্পের অর্থায়ন এবং এটি কতটা বাস্তবসম্মত, তা পুনরায় যাচাই করে দেখছে দেশটি। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত চারজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রিয়াদের 'নিউ মুরাব্বা' উন্নয়ন প্রকল্পের কেন্দ্রে থাকার কথা ছিল এই মুকাআব ভবনের। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের 'ভিশন ২০৩০'-এর অধীনে নেওয়া একের পর এক বিলাসবহুল ও মেগা প্রকল্পের মধ্যে এটি সর্বশেষ, যার কাজ স্থগিত বা কমিয়ে আনা হলো। মূলত খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ) তাদের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলো থেকে সরে আসছে।
সৌদি আরব এখন তাদের ব্যয় পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। নিওম (NEOM) সিটির 'দ্য লাইন'-এর মতো কল্পবিজ্ঞান সদৃশ ভবিষ্যৎমুখী প্রকল্পগুলোর চেয়ে এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যেসব প্রকল্প থেকে দ্রুত মুনাফা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন সৌদি সরকারের মূল নজর ২০৩০ সালের ওয়ার্ল্ড এক্সপো এবং ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে। এ ছাড়া ৬০ বিলিয়ন ডলারের 'দিরিয়াহ' সাংস্কৃতিক এলাকা এবং পর্যটন মেগাপ্রকল্প 'কিদ্দিয়া'র কাজকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় সৌদি আরবের রাজকোষের ওপর চাপ বাড়ছে। ভিশন ২০৩০-এর বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানোর জন্য তেলের দাম যতটা থাকা প্রয়োজন, বর্তমান বাজার দর তার চেয়ে অনেক নিচে। ফলে বিশাল সব প্রজেক্টে লাগামহীন অর্থ ঢালার বদলে নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে সৌদি সরকারকে।
তবে রিয়াদের সেই আলোচিত 'দ্য মুকাআব'-এর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। প্রকল্পটির পাইলিং ও মাটি খোঁড়ার কাজ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তবে এই বিশাল ভবনের চারপাশের আবাসন প্রকল্পের কাজগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী চলবে বলে জানানো হয়েছে।
মুকাআব ভবনটি হওয়ার কথা ছিল ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৪০০ মিটার প্রস্থের একটি ভবন। এর ভেতরে একটি বিশাল গম্বুজ থাকার কথা ছিল, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ডিসপ্লে দিয়ে আবৃত থাকবে। এটি হতো পৃথিবীর বৃহত্তম এআই ডিসপ্লে। দর্শনার্থীরা ৩০০ মিটার উঁচু একটি সিঁড়ি সদৃশ স্থাপত্য বা 'জিক্কুরাত' থেকে এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ পেতেন।
বলা হচ্ছিল, এই 'মুকাআব' ভবনটি আয়তনে এত বিশাল যে এর ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং অনায়াসেই এঁটে যাবে।
আবাসনবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'নাইট ফ্রাঙ্ক'-এর হিসাব অনুযায়ী, পুরো নিউ মুরাব্বা প্রকল্পের পেছনে সৌদি আরবের খরচ হতে পারে প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পার্শ্ববর্তী দেশ জর্ডানের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সমান। তবে বিশাল এই প্রকল্পের বিপরীতে এখন পর্যন্ত মাত্র ১০ কোটি ডলার সমমূল্যের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির কাজ আগে ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও এখন তা ১০ বছর পিছিয়ে ২০৪০ সাল নাগাদ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে 'দ্য মুকাআব' ভবনটির নকশা যখন প্রথম জনসমক্ষে আনা হয়, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি নিয়ে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ভবনটির কিউব আকৃতির সঙ্গে পবিত্র মক্কার কাবা শরিফের সাদৃশ্য থাকায় অনেকে এর কড়া সমালোচনা করেছিলেন।
বিশাল খরচ, কারিগরি জটিলতা এবং তেলের বাজারের অস্থিরতার কারণে আপাতত এই মেগাপ্রকল্পের ভবিষ্যৎ ঝুলে গেল।
টিজে/টিকে