কিশোরগঞ্জে ১১ দলের নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দিয়ে যুবসমাজকে বাংলা গড়ার কারিগরে পরিণত করা হবে। বেকার ভাতা দিয়ে নয়; মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
তরুণরাই বাংলাদেশ চালাবে মন্তব্য করে তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সেইদিন তোমরা গর্ব করে বলতে পারবে, আমিই বাংলাদেশ, আমরাই বাংলাদেশ। এমন একটি দেশই তোমাদের হাতে তুলে দিতে চাই। আমরা বাংলাদেশ নামক উড়োজাহাজের ককপিটে তোমাদেরকে বসাতে চাই।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী সরকারি কলেজ খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের তিন ভাগের একভাগ হাওর। এ হাওর শুধু ডালভাত নয়; প্রোটিনেরও যোগান দেয়। কিন্তু উন্নয়নের নামে নদীগুলোকে খুন করা হয়েছে। হাওর-বিলগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা এগুলোতেও হাত দেব। নদীর জীবন ফিরে এলে বাংলাদেশের জীবনও ফিরে ফিরে আসবে। নদী দিয়ে আমাদের উন্নয়নের সংস্কার শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই মানুষ শান্তিতে-নিরাপদে থাকবে। কৃষক তার জমিতে ফসল ফলাবে। শ্রমিক শ্রমের ন্যায্য পাওনা পাবে। সকলে মানবিক মর্যাদায় বাস করবে। এদেশে হাত পাতার মানুষ থাকবে না। কেবল কাজ করার মানুষ থাকবে। অক্ষমদের দায়িত্ব নেবে সরকার। মা-বোনেরা ঘরে-বাইরে নিরাপদে চলাফেরা করবে। সকল শিশুর চিকিৎসা ও শিক্ষার দায়িত্ব নেবে সরকার।
জামায়াত আমির বলেন, কিশোরগঞ্জ শিল্পভিত্তিক জেলা নয়, এটি একটি কৃষিনির্ভর জেলা। তাই কৃষিকে কেন্দ্র করেই উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আমরা কৃষিকে শিল্পে পরিণত করব, ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এত টাকা কোথায় পাওয়া যাবে। আমরা যদি ক্ষমতায় আসতে পারি তাহলে দেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে, সেই অর্থ পেটে হাত ঢুকিয়ে বের করব, ইনশাআল্লাহ এবং তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করে রাষ্ট্রের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
জামায়াতের এ শীর্ষ নেতা বলেন, এদেশের মানুষ স্বভাবগতভাবে ধর্মপ্রাণ। তারা অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। এটিই ধর্মের সৌন্দর্য। আমরা দেশটাকে সব ধর্ম দিয়ে ফুলের মতো করে সাজাব। ধর্ম দিয়ে পুরো জাতিকে টুকরো টুকরো করতে কাউকে সুযোগ দেব না। অতীতের কাসুন্দি শেষ। এ বিভেদ আর শুনতে চায় না কেউ। এগুলো শুনিয়ে শুনিয়ে জনগণকে ভাগ করে রেখে জাতির ভাগ্য যারা ছিনতাই করেছে- তাদের জায়গা আর বাংলাদেশে হবে না।
শফিকুর রহমান বলেন, এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময়। পিছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই। পেছনে (অতীত) নিয়ে যারা কামড়াকামড়ি করতে চায় তারা তা করুক। আমরা এগিয়ে যাব। নিজের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার দাবি করে তিনি বলেন, মা-বোনেরা অপমানিত হলে আমি প্রতিবাদ করি। এ কারণে কিছু লোক আমার পেছনে লেগেছে। আমার এক্স আউডি হ্যাক করে নোংরা কথা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের আমির বলেন, আমরা দলীয় সরকার কায়েম করতে চাই না। জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ও চাই না। আমি ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হলে সেই বিজয় হবে আমাদের সবার। দল-গোষ্ঠী-পরিবারতন্ত্রের বিজয় আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা পুরোনো রাস্তায় অন্ধকার গলিতে নয়; আলোকিত পথেই হাঁটব।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমার ভোট আমি দেব, তোমার ভোটও আমি দেবো- সেই দিন আর ফিরে আসবে না। চব্বিশের যোদ্ধারা ঘুমিয়ে পড়েনি। তারা নিজেদের ভোটের পাশাপাশি অন্যদের ভোটও পাহারা দেবে। কোনো দুর্বৃত্তকে আর ভোটে হাত দিতে দেওয়া হবে না’।
প্রশাসনের উদ্দেশ্যে দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কারোর অন্যায় আবদার শুনবেন না। আমরা আনুকল্য চাই না। কিন্তু আমাদের ক্ষতি করতে এলে আমরা ছেড়ে দেব না। সুষ্ঠু নির্বাচনে যিনি নির্বাচিত হয়ে আসবেন, আমরা তাকে অভিনন্দন জানাতে প্রস্তুত।
কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির ও কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে জামায়াতের এমপি প্রার্থী অধ্যাপক মো. রমজান আলীর সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন- কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে জামায়াতের প্রার্থী, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদের শ্যালক প্রফেসর ডা. কর্নেল (অব.) জেহাদ খান, কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. রোকন রেজা শেখ, কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আতাউল্লাহ আমিন।
এছাড়া সদ্য জামায়াতে যোগদানকৃত কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে বিএনপির সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান রঞ্জন, এনসিপির কেন্দ্রীয় (উত্তরাঞ্চল) সংগঠক আহনাফ সাইদ খান, জেলা জামায়াতের সাবেক দুই আমির মাওলানা আব্দুস সালাম ও অধ্যক্ষ মাওলানা তৈয়বুজ্জামান, সাবেক নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মোসাদ্দেক ভূঁইয়া, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের সনাতনী শাখার সভাপতি কৃষ্ণ চন্দ্র বসাক, খেলাফত মজলিশের জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুল আহাদ প্রমুখ।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মো. রমজান আলী স্থানীয় বিভিন্ন উন্নয়ন-বঞ্চনার তথ্য তুলে ধরে বলেন, জামায়াত সরকার গঠন করলে হাওর উন্নয়ন বোর্ড পুনর্গঠন, হাওরের কৃষিপণ্য সংরক্ষণে পর্যাপ্ত হিমাগার নির্মাণ, ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়কটিকে মহাসড়কে রূপান্তর ও ছয় লেনে উন্নীতকরণ, কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনাকে সবল করা ও বাজিতপুর-কটিয়াদীতে আধুনিক কৃষি ইনস্টিটিউট করা হবে।
এমআই/এসএন