ভারতের আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা রাজ্যের বাংলাভাষী মুসলিমদের আবারও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি ভারতীয় আদালতের রায়ের কথা উল্লেখ করে তাদের ‘মিয়া মুসলিম’ বলে উল্লেখ করে বলেছেন, বাপু মহাত্মা গান্ধী বেঁচে থাকলে এই তথাকথিত অভিবাসী বিতাড়ন ইস্যুতে আসামবাসীর পাশে দাঁড়াতেন।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা গতকাল শনিবার বলেন, যদি মহাত্মা গান্ধী বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে আসামবাসীর লড়াইকে সমর্থন করতেন। তাঁর মতে, রাজ্যের অধিকার ও পরিচয় রক্ষা করা কোনোভাবেই ঘৃণার প্রকাশ নয়। মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের জবাবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রে সরকার বদলায় নির্বাচনের মাধ্যমে। ভয় দেখিয়ে বা কোনো নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে আগেভাগে সরানোর চেষ্টা করে সরকার পরিবর্তন করা যায় না।
এক্সে শেয়ার করা এক পোস্টে হিমন্ত বিশ্বশর্মা লেখেন, ‘আজ যদি বাপু বেঁচে থাকতেন, তিনি আসামবাসীর পাশেই দাঁড়াতেন। আসলে ইতিহাস বলছে, তাঁর হস্তক্ষেপের কারণেই আসাম পাকিস্তানের অংশ হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল। অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে ঘৃণা নয়। এটি আসামবাসীর অধিকার, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার বিষয়। আমি আপনাকে খুব স্পষ্টভাবে বলছি, গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তন হয় মানুষের ভোটে, ভয় দেখিয়ে নয় বা কোনো নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে টেনে নামানোর চেষ্টায় নয়।’
মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী এক্সে লিখেছিলেন, ‘যদি ভারত বাপুর ভারতের মতো হতো, তাহলে দেশের নাগরিকেরা আসামের মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর অফিস থেকে টেনে বের করত এবং তাঁর ঘৃণামূলক মন্তব্যের জন্য তাঁকে অভিশংসিত করত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ আমরা নাথুরাম গডসের ভারত, আর তার অনুসারী, ঘৃণা ও বিভাজনের উচ্চ পুরোহিত প্রধানমন্ত্রী মোদির দেশে বাস করছি।’
এই বিতর্ক শুরু হয়েছে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ‘মিয়া মুসলিম’ মন্তব্যকে ঘিরে। এই শব্দ ব্যবহার করে তিনি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া তথাকথিত অভিবাসীদের বোঝাতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তাঁর বক্তব্যের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলেন, ‘মিয়া মুসলিম’ শব্দটি তিনি তৈরি করেননি। তাঁর দাবি, বাংলাদেশ থেকে আসা যে জনগোষ্ঠীটি আসামে বসতি গড়েছে, তারাই নিজেদের পরিচয় দিতে এই শব্দটি ব্যবহার করে আসছিল।
এক্সে দেওয়া আরেক পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা মিয়া শব্দ ব্যবহার করায় আমাকে আক্রমণ করছেন-যে শব্দটি আসামে বাংলাদেশি মুসলিম অবৈধ অভিবাসনের প্রেক্ষিতে ব্যবহৃত হয়-তাঁদের আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আসাম সম্পর্কে কী বলেছে, তা পড়া উচিত। এটি আমার ভাষা নয়, আমার কল্পনা নয়, কিংবা রাজনৈতিক অতিরঞ্জনও নয়।’
তিনি সুপ্রিম কোর্টের একটি পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করে রাজ্যের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়ে সতর্কবার্তার কথা তুলে ধরেন। মুখ্যমন্ত্রী পোস্টে লেখেন, ‘এগুলো আদালতের নিজের ভাষা-আসামে নীরব ও ধ্বংসাত্মক জনসংখ্যাগত আগ্রাসনের ফলে লোয়ার আসামের ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলো হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। অবৈধ অভিবাসীদের আগমনে এই জেলাগুলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পরিণত হচ্ছে। এরপর বাংলাদেশে যুক্ত হওয়ার দাবি ওঠা শুধু সময়ের ব্যাপার হবে। লোয়ার আসাম হারালে পুরো উত্তর-পূর্ব ভারত মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং ওই অঞ্চলের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ জাতির হাতছাড়া হবে।’
এদিকে, আসাম থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসের এমপি গৌরব গগৈ শুক্রবার হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ‘মিয়া মুসলিম’ মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের নাম ‘অপব্যবহার’ করছেন। এক্সে গৌরব গগৈ বলেন, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার রাজনীতি মানেই ‘অসততা ও নির্লজ্জতার রাজনীতি।’ তাঁর দাবি, আসামের মুখ্যমন্ত্রী ‘মিথ্যা বলছেন’ এবং সুপ্রিম কোর্ট কখনোই এই ধরনের ভাষা ‘তৈরি বা গ্রহণ’ করেনি।
গগৈ লেখেন, ‘অসততা ও নির্লজ্জতাই হিমন্ত বিশ্ব শর্মার রাজনীতির পরিচয়। তিনি এতটাই নিচে নেমে গেছেন যে সম্মানীয় সুপ্রিম কোর্টের নাম অপব্যবহার করছেন। তিনি দাবি করছেন, সর্বানন্দ সোনোয়াল মামলায় আদালতের নিজস্ব শব্দ উদ্ধৃত করছেন। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে ভাষা তিনি উদ্ধৃত করেছেন, তা সুপ্রিম কোর্টের নয়। আদালত ওই শব্দগুলো না লিখেছে, না সেগুলো গ্রহণ করেছে। একটি নির্বাহী রিপোর্টকে বিচার বিভাগের মন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা ইচ্ছাকৃত অবমাননা।’
আরআই/টিকে