‘অ্যাফ্রোবিটের জনক’ ফেলা কুটি, প্রথম আফ্রিকান হিসেবে পাচ্ছেন গ্র্যামির আজীবন সম্মাননা

ফেলা কুটির সংগীতধারা থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে জন্ম নিয়েছে আজকের ‘অ্যাফ্রোবিটস’। বিশ্বজুড়ে এই ঘরানার বিপুল সাফল্যের পর ২০২৪ সালে গ্র্যামি পুরস্কারে যুক্ত হয় ‘সেরা আফ্রিকান পারফরম্যান্স’ নামে নতুন বিভাগ। চলতি বছর নাইজেরিয়ার সুপারস্টার বার্না বয়ও মনোনয়ন পেয়েছেন ‘সেরা গ্লোবাল মিউজিক অ্যালবাম’ শাখায়।

ভক্তদের হৃদয়ে তিনি অনেক আগে থেকেই 'অ্যাফ্রোবিটের রাজা'। অবশেষে বিশ্ব সংগীতের আঙিনায় মিলছে সেই স্বীকৃতি। মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে মরণোত্তর আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন নাইজেরিয়ার এই কিংবদন্তি তারকা ফেলা কুটি। ৫৮ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়েছিলেন তিনি।

ফেলা কুটির ছেলে ও সংগীতশিল্পী শিউন কুটি বিবিসিকে বলেন, 'বাবা মানুষের হৃদয়ে ছিলেন বহুদিন। এখন গ্র্যামিও সেটা স্বীকার করে নিল। এ যেন দ্বিগুণ জয়।' তিনি আরও বলেন, 'এটি ফেলা কুটির গল্পে একটা ভারসাম্য এনে দিল।'

দীর্ঘদিনের বন্ধু ও ম্যানেজার রিকি স্টেইন বলেন, 'দেরিতে হলেও এই স্বীকৃতি মন্দের ভালো। আগে তাদের আগ্রহের তালিকায় আফ্রিকা খুব একটা গুরুত্ব পেত না। তবে ইদানীং পরিস্থিতি কিছুটা বদলাচ্ছে।'

ফেলা কুটির গানের ধারা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই আজকের 'অ্যাফ্রোবিটস'-এর জন্ম। এর বিশ্বজোড়া সাফল্যের পর ২০২৪ সালে গ্র্যামি 'সেরা আফ্রিকান পারফরম্যান্স' বিভাগ চালু করে। এ বছর নাইজেরিয়ান সুপারস্টার বার্নাবয়ও 'সেরা গ্লোবাল মিউজিক অ্যালবাম' বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছেন।

তবে ফেলা কুটিই প্রথম আফ্রিকান, যিনি মরণোত্তর হলেও আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন। ১৯৬৩ সালে আমেরিকান গায়ক ও অভিনেতা বিং ক্রসবিকে দিয়ে এই পুরস্কারের সূচনা হয়েছিল। এ বছর ফেলা কুটির সঙ্গে এই সম্মাননা পাচ্ছেন মেক্সিকান-আমেরিকান গিটারিস্ট কার্লোস সান্তানা, 'ফাংক কুইন' চাকা খান এবং পল সাইমন।
ফেলা কুটিই প্রথম আফ্রিকান, যিনি মরণোত্তর হলেও আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন

পুরস্কার নিতে গ্র্যামির আসরে থাকবেন ফেলা কুটির পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীরা। শিউন কুটি বলেন, 'বিশ্বের মানুষের বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের জন্য এটা প্রয়োজন। শুধু আমার বাবা বলে নয়, সবার জন্যই।'

স্টেইন মনে করেন, ফেলা কুটিকে চেনা জরুরি। কারণ তিনি সেই সব মানুষের পক্ষে লড়েছেন, যারা জীবনে শুধুই বঞ্চনা পেয়েছেন। তিনি বলেন, 'সরকারের সামাজিক অবিচার, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। ফেলার এই দিকটি উপেক্ষা করা অসম্ভব।'

ফেলা অনিকুলাপো কুটি শুধু একজন সুরস্রষ্টা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একাধারে সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক আন্দোলনকারী এবং অ্যাফ্রোবিটের অবিসংবাদিত স্থপতি। ড্রামার টনি অ্যালেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এই ধারার সূচনা করেন। পশ্চিম আফ্রিকান ছন্দের সঙ্গে জ্যাজ, ফাংক ও হাইলাইফের মিশ্রণ ঘটাতেন তিনি। সঙ্গে থাকত দীর্ঘ ইমপ্রোভাইজেশন বা তাৎক্ষণিক সুরের খেলা এবং রাজনীতিসচেতন লিরিক। ১৯৯৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় তিন দশকের ক্যারিয়ারে ৫০টিরও বেশি অ্যালবাম প্রকাশ করেন তিনি। তার গানে মিশে ছিল আদর্শ, প্রতিরোধ আর প্রতিবাদ।

নাইজেরিয়ার তৎকালীন সামরিক শাসকদের চক্ষুশূল ছিলেন তিনি। ১৯৭৭ সালে 'জম্বি' অ্যালবাম প্রকাশের পর তার ওপর নেমে আসে খড়গ। গানে তিনি সরকারি সেনাদের আজ্ঞাবহ ও মগজহীন বলে বিদ্রূপ করেছিলেন। এর জেরে লাগোসে তার বাড়ি 'কালাকুটা রিপাবলিক'-এ হামলা চালানো হয়। বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, বাসিন্দাদের ওপর চলে নির্যাতন। এই হামলায় আহত হয়ে পরে মারা যান তার মা ফুনমিলায়ো রানসাম-কুটি।

পিছু হঠার পাত্র ছিলেন না ফেলা। তিনি গান আর সাহসের মাধ্যমে জবাব দেন। মায়ের কফিন নিয়ে সোজা হাজির হন সরকারি দপ্তরে। প্রকাশ করেন 'কফিন ফর হেড অফ স্টেট' নামের গান। শোককে তিনি পরিণত করেন প্রতিবাদে।

তার আদর্শ ছিল প্যান-আফ্রিকানিজম, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং আফ্রিকান সমাজতন্ত্রের মিশ্রণ। রাজনৈতিক চেতনা গঠনে মায়ের প্রভাব ছিল বিশাল। এ ছাড়া আমেরিকান গায়িকা ও অ্যাক্টিভিস্ট সান্দ্রা ইজাডোর তার বিপ্লবী চিন্তাভাবনায় শান দিয়েছিলেন। ফেলা কুটির সঙ্গীত আফ্রিকান থেকে অভিবাসী, সকলের কাছেই সমাদৃত।

জন্মগত নাম ওলুফেলা ওলুসেগুন ওলুদোটন রানসাম-কুটি হলেও পশ্চিমা শেকড় থাকায় 'রানসাম' অংশটি তিনি বর্জন করেন। ১৯৭৮ সালে এক আলোচিত অনুষ্ঠানে তিনি একসঙ্গে ২৭ জন নারীকে বিয়ে করেন। এরা ছিলেন তার সহযোগী, শিল্পী ও সংগঠনের কর্মী।

নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বারবার গ্রেপ্তার, মারধর ও সেন্সরশিপের শিকার হয়েছেন ফেলা। কিন্তু এই দমন-পীড়ন তার প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্টেইন বলেন, 'তিনি পুরস্কারের আশায় কাজ করতেন না। তিনি চেয়েছিলেন মুক্তি। মনের মুক্তি। তিনি ছিলেন নির্ভীক ও সংকল্পবদ্ধ।'

শুধু নাইজেরিয়া নয়, ঘানাও তার সংগীতের বিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ইটি মেনসা, ইবো টেইলর ও প্যাট থমাসের মতো ঘানাইয়ান শিল্পীদের হাত ধরে 'হাইলাইফ' মিউজিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর গিটার, হর্ন সেকশন ও নাচের ছন্দ ফেলার শুরুর দিকের গানে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি ঘানায় সময় কাটিয়েছেন, হাইলাইফ শিখেছেন এবং পরে তার সঙ্গে জ্যাজ, ফাংক ও নিজের ইওরুবা জাতির ছন্দ মিশিয়েছেন।

মঞ্চে ফেলা কুটি ছিলেন এক অনন্য চরিত্র। প্রায়ই খালি গায়ে বা আফ্রিকান কাপড়ে দেখা যেত তাকে। হাতে স্যাক্সোফোন, চোখে তীব্র দৃষ্টি। নেতৃত্ব দিতেন ২০ জনেরও বেশি সদস্যের এক বিশাল ব্যান্ডের। লাগোসের 'আফ্রিকা শ্রাইন'-এ তার পরিবেশনাগুলো ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ওগুলো ছিল একাধারে কনসার্ট, রাজনৈতিক সমাবেশ এবং আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান।

স্টেইন বলেন, 'ফেলা যখন বাজাতেন, কেউ হাততালি দিত না। দর্শক আলাদা কেউ ছিল না, তারাও ছিল সেই পরিবেশনার অংশ।' সংগীত সেখানে শুধুই দেখার বিষয় ছিল না, ছিল একাত্ম হওয়ার মাধ্যম।

শিল্পী ও ডিজাইনার লেমি ঘারিওকউ ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে ফেলার ২৬টি অ্যালবামের প্রচ্ছদ তৈরি করেছিলেন। মরণোত্তর এই পুরস্কারকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, 'ফেলা গত ২৮ বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষ হিসেবে আছেন। দিন দিন তার উত্তরাধিকার বাড়ছে। এটাই অমরত্ব।'

আজও সারা বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে তার গান জনপ্রিয়। বার্নাবয়, কেন্ড্রিক লামার এবং ইদ্রিস এলবার মতো আধুনিক শিল্পীদের কাজে তার প্রভাব স্পষ্ট। অভিনেতা ও ডিজে ইদ্রিস এলবা তার বড় ভক্ত। তিনি ফেলাকে শাদে এবং ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার মতো আইকনদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ফেলা কুটি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বড় বড় উৎসবে গান গেয়েছেন। আধুনিক আফ্রিকার এক সাহসী ও রাজনৈতিক রূপ তিনি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন।
বাবা মারা যাওয়ার সময় শিউন কুটির বয়স ছিল মাত্র ১৪। তিনি বলেন, 'বাবা আমাকে কখনো বাচ্চা মনে করতেন না। আমার কাছে কিছুই লুকাতেন না। সব বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতেন।'

বাবার খ্যাতি তাকে ছুঁতে পারেনি। শিউন বলেন, 'আমি বুঝতামই না যে বাবা বিখ্যাত। এর কৃতিত্ব তার। তিনি আমাকে মাটির মানুষ করে রেখেছিলেন।'

বাবার কাছ থেকে তিনি শিখেছেন শৃঙ্খলা, স্পষ্টতা আর মানবতা। শিউন বলেন, 'ফেলা আমাদের বাবা ছিলেন, কিন্তু তিনি আমাদের সম্পত্তি ছিলেন না। ফেলা ছিলেন নিজের। কিন্তু আমরা সবাই ছিলাম তার।'

ফেলা কুটি চাইতেন সন্তানরাও তাকে নাম ধরে ডাকুক, কোনো উপাধি দিয়ে নয়। একবার 'পপস' বা বাবা ডাকার কারণে পকেটমানি কেটে নেওয়া হয়েছিল শিউনের। সম্মানের এক ভিন্ন শিক্ষা ছিল সেখানে। তিনি সবসময় মনে করিয়ে দিতেন যে নিজের চেয়ে অন্যের সেবা করাই তার কাজ।

ফেলা কুটি একাধিক ব্যান্ডের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে 'আফ্রিকা ৭০' এবং পরে 'ইজিপ্ট ৮০' বিখ্যাত। পরের ব্যান্ডটি এখন তার ছেলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এগুলো সাধারণ ব্যান্ড ছিল না। ছিল সংগীতের একেকটি দল, যাদের শেখানো হতো শৃঙ্খলা ও আদর্শ।

স্টেইন বলেন, 'তিনি প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র নিজে টিউন করতেন। সংগীত তার কাছে বিনোদন ছিল না, ছিল এক ব্রত বা মিশন।'

কেএন/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস

তাপমাত্রা, বজ্র ও শিলাবৃষ্টি নিয়ে নতুন বার্তা Feb 02, 2026
img
জনগণ রঙিন জামা পরা ফ্যাসিবাদকে লাল কার্ড দেখিয়েছে : জামায়াত আমির Feb 02, 2026
img
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলা নিয়ে মুখ খুললেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক Feb 02, 2026
img
ভারত ম্যাচ বয়কট নিয়ে মুখ খুললেন পাকিস্তান অধিনায়ক Feb 02, 2026
img
অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে ইইউ Feb 02, 2026
img
রোমাঞ্চকর ম্যাচে ফুলহ্যামকে ৩-২ গোলে হারাল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড Feb 01, 2026
img
ঈদে ‘মালিক’ নিয়ে ফিরছেন শুভ-মিম Feb 01, 2026
img
শেষ মুহূর্তে এমবাপের গোলে স্বস্তির জয় রিয়াল মাদ্রিদের Feb 01, 2026
img
দেশের বাজারে কমল স্বর্ণের দাম Feb 01, 2026
ট্রাম্পের বিতর্কিত পদক্ষেপে ঝুঁকিতে ইউক্রেন শান্তি আলোচনা Feb 01, 2026
img
হাসপাতাল চত্বরে ভক্তদের ভিড়ের মাঝে রামচরণ! Feb 01, 2026
img
‘বিফ স্টেক’ বিতর্কে ক্ষোভ প্রকাশ অভিনেত্রী সৌমিতৃষার Feb 01, 2026
img
প্রকাশ পেল নেপালে শুটিং হওয়া সেই গান Feb 01, 2026
img
প্রধান ২ সিনেমায় কি তবে দেবের নায়িকা হিসেবে দেখা যাবে সৌমিতৃষাকে? মুখ খুললেন প্রযোজক Feb 01, 2026
img
জান্নাতের টিকিট বিক্রি না করতে পেরে এখন বিকাশ ও এনআইডি নিচ্ছে জামায়াত: কামরুল হুদা Feb 01, 2026
img
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পার্টির জানাজা : ১১ দলীয় জোট Feb 01, 2026
img
একসঙ্গে তিন-চারটে প্রেম করার ‘পরামর্শ’ স্বস্তিকার! বিতর্ক বাঁধতেই কী জবাব অভিনেত্রীর? Feb 01, 2026
img
নারায়ণগঞ্জে বিএনপি কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি, অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা Feb 01, 2026
img
রাজধানীতে ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ মিছিল Feb 01, 2026
img
রাজধানীতে ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ মিছিল Feb 01, 2026