প্রয়াত মার্কিন ব্যবসায়ী ও কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন সম্পর্কিত নথিতে আবারও ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের ছোট ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নাম এসেছে। বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন খোদ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেছেন, জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত নথি ও কর্মকাণ্ডের তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সহযোগিতা করা উচিত।
এপস্টেইন ফাইলসে ব্রিটিশ যুবরাজ প্রিন্স অ্যান্ড্রুর পাশাপাশি মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ও টেসলার ইলন মাস্কের মতো বহু ধনকুবের ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে।
মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশিত ইমেইলগুলোর মধ্যে এমন কিছু ইমেইল রয়েছে, যাতে এপস্টেইনকে বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানোর কথা উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে এপস্টেইন তার ওই যোগাযোগকারী ব্যক্তিকে ২৬ বছর বয়সি এক রুশ নারীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন বলেও নথিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া প্রকাশিত কিছু ছবিতে এমন দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে অ্যান্ড্রু বলে ধারণা করা একজন ব্যক্তি মেঝেতে শুয়ে থাকা এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। এসব ছবির প্রেক্ষাপট বা সময় সম্পর্কে নথিতে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়া হয়নি।
নতুন এই তথ্য প্রকাশের পর আবারও প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে তিনি রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। সর্বশেষ নথিগুলো ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে নিজ দেশে তীব্র সমালোচনার মধ্যে আছেন প্রিন্স অ্যান্ড্রু। এ ঘটনায় অ্যান্ড্রু ‘প্রিন্স’ উপাধি হারিয়েছেন তিনি। তাকে ছাড়তে হয়েছে উইন্ডসরে বরাদ্দ দেয়া রাজকীয় বাসভবন ‘রয়েল লজ’ও।
এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কিত হাজার হাজার নতুন ফাইল প্রকাশের পর তার (এপস্টেইনের) সঙ্গে বিশ্বের বেশ কয়েকজন ধনকুবের ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
নথিতে উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক এবং নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির মা ভারতীয় বংশোদ্ভূত চলচ্চিত্র পরিচালক মীরা নায়ারের নাম। যদিও তারা পূর্বে এপস্টেইনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক নাকচ করার চেষ্টা করেছিলেন। নতুন করে নথি প্রকাশের পর এখন জোর তদন্তের মুখে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রায় ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করে। তার মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ভিডিও। ১ লক্ষ ৮০ হাজার ছবি। এ নিয়ে হইচই পড়েছে বিশ্বজুড়ে। নতুন প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে বেশ কিছু ইমিইলও রয়েছে। নিজেই নিজেকে এই ইমেলগুলো করেছিলেন এপস্টেইন।
এমনই এক ইমেইলে দাবি করা হয়েছে, রুশ নারীদের শয্যাসঙ্গী হওয়ার পর যৌনরোগে আক্রান্ত হন মাইক্রোসফ্ট প্রতিষ্ঠাতা গেটস। তারপর তিনি গোপনে স্ত্রী মেলিন্ডা গেটসকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াতে চেয়েছিলেন। যদিও এই সব দাবি নাকচ করেছেন গেটস। গেটস ফাউন্ডেশন নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছে, এ ধরনের অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও মিথ্যা’।
টেসলার ইলন মাস্কের ইমেইলগুলোতে দেখা যায়, ২০১২-২০১৩ সালে তিনি এপস্টেইনের কারিবীয় দ্বীপে কয়েকবার যেতে চেয়েছিলেন। ২০১২ সালের এক ইমেইলে মাস্ক লিখেছিলেন, ‘আপনার দ্বীপে কোন দিন/রাত সবচেয়ে বেপরোয়া পার্টি হবে?’ যদিও ২০১৩ সালে একটি পরিকল্পিত ভ্রমণ শেষ পর্যন্ত এপস্টেইনের শিডিউলের কারণে বাতিল হয়।
প্রকাশিত এই ইমেইল নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় মাস্ক শনিবার (৩১ জানুয়ারি) এক্স-এ জানিয়েছেন, ‘এপস্টেইনের সঙ্গে আমার কিছু ইমেইল ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে, যা আমার সুনাম নষ্ট করতে ব্যবহার করা হতে পারে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি তার দ্বীপে বা ‘লোলিটা এক্সপ্রেস’-এ যেতে বহুবার আমন্ত্রণ নাকচ করেছি।’
ফাইলগুলোতে ট্রাম্প সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এপস্টেইনের দ্বীপে যাওয়ার ইমেইলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একটি ইমেইল এপস্টেইনের সহকারীর কাছ থেকে লুটনিকের কাছে ফরওয়ার্ড করা হয়েছিল। এই ইমেইল থেকে এটা স্পষ্ট যে, ওই সময়ে তাদের দুজনের মধ্যে দেখা হয়েছিল।
তবে এপস্টেইন ফাইল নিয়ে তীব্র বিতর্কের মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরে লুটনিক এপস্টেইনকে ‘ঘৃণ্য’ এবং ‘সবচেয়ে বড় ব্ল্যাকমেইলার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন যে, তিনি বহু বছর আগে তার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করেছেন।
নতুন নথিতে লুটনিকের নাম নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘লুটনিকের এপস্টেইনের সঙ্গে ‘সীমিত সম্পর্ক ছিল, তা তার স্ত্রীর উপস্থিতিতে এবং তিনি কখনও কোনো অভিযোগের সম্মুখীন হননি।’
নতুন প্রকাশিত ফাইলে উঠে এসেছে নিউইয়র্ক সিটি মেয়র জোহরান মামদানির মা মীরা নায়ারেরও। এক নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালে নিজের সিনেমা ‘আমেলিয়া’-র প্রচারে এপস্টেইনে বান্ধবী ও অপর এক যৌন নিপীড়ক ঘিসলেইন ম্যাকওয়েল আয়োজিত একটি নৈশভোজে যোগ দেন মামদানির মা মীরা।
বেশকিছু নথিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নামও এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এপস্টেইন ফাইলস’-এ বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ইসরাইলে কূটনৈতিক সফরের ব্যবস্থা করার জন্য জেফরি এপস্টেইনের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে মোদি ইসরাইলে গিয়ে নেচেছেন ও গেয়েছেন বলেও মেইলে বলা হচ্ছে। তবে মোদির বিষয়ে থাকা তথ্যকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লি।
এর আগে প্রকাশিত ফাইলগুলোয় এপস্টাইনের সঙ্গেই দেখা গিয়েছিল স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনকে। এপস্টিনের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা অস্বীকার করেননি ট্রাম্প। তবে বিল ক্লিনটন এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি।
এপস্টেইন ফাইল নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক বহুদিনের। ভুক্তভোগীরা বহুদিন ধরে মার্কিন সরকারের কাছে এই নথিগুলো প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে নথিগুলো প্রকাশ করবেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর নথি প্রকাশে গড়িমসি শুরু করেন তিনি।
এক পর্যায়ে ঘরে-বাইরে তীব্র চাপের মুখে পড়ে গত নভেম্বরে এপস্টেইন সংক্রান্ত ফাইল প্রকাশ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ২০০৮ সালে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে নাবালিকা ধর্ষণ ও নিগ্রহের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। ২০১৯ সালের অগস্টে গ্রেফতারির মাসখানেকের মাথায় জেলেই আত্মহত্যা করেন তিনি।
টিজে/টিএ