আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ভর করে শুরু হয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি আয়ত্ব করার কোনো বিকল্প নেই। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় যেন ভবিষ্যত্ প্রজন্ম টিকে থাকে পারে, তাই জাতীয় পাঠক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অন্তর্ভুক্ত করছে আরব দেশগুলো।
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাথমিক স্তর থেকেই প্রোগ্রামিং, রোবোটিক্স এবং সমস্যা সমাধানমূলক শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে এআই, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং স্মার্ট সিস্টেম বিষয়ে বিশেষ কোর্স চালু করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তবমুখী প্রযুক্তিগত দক্ষতাও অর্জন করছে।
ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর, বাহরাইন ও কাতার তাদের জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই তিন দেশ ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে এআই শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে। দেশগুলো আশা করছে, এই উদ্যোগ ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এআই শেখানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে উপসাগরীয় দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি ২০১৭ সালে বিশ্বের প্রথম এআই মন্ত্রী নিয়োগ করে এবং স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে কোডিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও মেশিন লার্নিং অন্তর্ভুক্ত করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলতি শিক্ষাবর্ষ (২০২৫-২০২৬) থেকে কিন্ডারগার্টেন থেকে লেভেল টুয়েলভ পর্যন্ত কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার পাঠদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশের সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তা বাধ্যতামূলক।
দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বর্ণনা মতে, ইংরেজি মাধ্যম বা আরবি মাধ্যম অথবা ইসলামী ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সবাই শিক্ষার্থীদের কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক এআই শেখাতে বাধ্য থাকবে। আমিরাত সরকার এআই শেখাতে সারা দেশে এক হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। তারা বলছে, প্রাথমিক স্তরে এআইয়ের মৌলিক ধারণা, নৈতিকতা, বৈশ্বিক প্রভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো শেখানো হবে।
বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত শিক্ষার সব স্তরে এআই শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, তাদের লক্ষ্য হলো তারা শিক্ষার্থীদেরকে তথ্যমূলক ও প্রয়োগিক অভিজ্ঞতা উভয়টি দিতে চায়। এই ক্ষেত্রে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাতটি দিককে প্রাধান্য দিয়েছেন—মৌলিক ধারণা, ডেটা (তথ্য), অ্যালগরিদম, সফটওয়্যার, নৈতিকতা, প্রয়োগ ও বাস্তবিক প্রয়োগ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সৌদি আরবও জাতীয় পাঠক্রমের সব স্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাঠদানকে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটি বলছে, ভিশন ২০৩০-এর অংশ হিসেবে মানবসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় তারা শিক্ষার্থীদেরকে এআই ও আধুনিক প্রযুক্তির পাঠদান করবে। তাদের দাবি, তারা এমন কারিকুলাম তৈরি করেছে যা শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন বহুমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করবে এবং আধুনিক বিশ্ব ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করবে। এই কারিকুলাম তৈরি করতে সৌদি আরবের শিক্ষা মন্ত্রণলায়, যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এসডিএআইএ এক যোগে কাজ করেছে।
অন্যদিকে মিসর চলতি শিক্ষাবর্ষ (২০২৫-২০২৬) থেকে কেবল প্রাথমিক স্তরে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ধীরে ধীরে তা অন্যান্য স্তরে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। গত বছর আগস্টে মিসরে আয়োজিত এআই বিষয়ক এক সম্মেলনে মিসরের শিক্ষা মন্ত্রী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই এআই সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, বিভিন্ন শিক্ষাস্তরে ধাপে ধাপে এআই ধারণা সংযোজন, ব্যবহারিক ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করা হবে। এআই ব্যবহারের নৈতিক দিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়েও গবেষণা অব্যাহত রাখবে মিসর।
শুধু এআই বিষয়ক পাঠদান করা নয়, বরং শিক্ষা উপকরণ হিসেবে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বেড়েছে আরব বিশ্বে। এআই প্রযুক্তি শিক্ষাদানের পদ্ধতিকে পাল্টে দিচ্ছে। আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্মার্ট ক্লাসরুম, এআই-চালিত লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এবং ভার্চুয়াল টিউটর ব্যবহূত হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শেখার গতি, দুর্বলতা ও আগ্রহ বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রদান সম্ভব হচ্ছে। ফলে শিক্ষার মান উন্নত হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার কমছে।
এআই পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্তিকে তরান্বিত করতে অনেক দেশ আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক এআই টুলস ও শিক্ষা সামগ্রি নির্মাণের ওপর গুরুত্ব প্রদান করছে। এজন্য কিছু আরব দেশ স্থানীয় ভাষায় এআই টুল ও শিক্ষাসামগ্রি তৈরিতে বিনিয়োগ করছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
তথ্যসূত্র : এডুকেশন ডটকম, আরব নিউজ ও আল আইন ডটকম
আইকে/টিএ